যাকাতের গুরুত্ব,ফাযায়েল ও মাসায়েল (১)
মাওলানা মুহাম্মদ জিয়াউল হক
যাকাত ইসলামের প্রধান আর্থিক এবাদত। এটি ইসলামের অর্থব্যবস্থার মূলভিত্তি ও ইলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ১৯ টি সূরায় ৩২টি স্থানে এরশাদ করেন- তােমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর। পক্ষান্তরে হাদীস শরীফে যাকাতকেকা নতারাতূল ইসলাম বা ইসলামের সেতুবন্ধন বলা হয়েছে। তাই ধনী ও দরিদ্রের অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন যাকাত। মুসলিম সমাজ হতে দারিদ্রতা দূরীকরণে এবং সমাজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম।
যাকাতের পরিচয় ও ফরয হওয়ার সময়কাল:
আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাতের শাব্দিক অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্রতা লাভ করা, প্রাচূর্য ও সংশােধিত হওয়া ইত্যাদি। (আল-মুফরাদাত ও মুনজাদ)
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তা'আলার সম্ভষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সম্পদের নির্দিষ্ট একটি অংশ হাশেমী ও তাদের দাস-দাসী ব্যতীত অন্য মুসলিম দরিদ্র ব্যক্তিকে বিনা স্বার্থে দান করার নাম যাকাত। (দুররুল মুখতার)
জমহুর ফোকাহায়ে কেরামের মতে, যাকাত হিজরি সালের দ্বিতীয় বর্ষে মদীনা পাকে ফরয করা হয়।
যাকাতের হুকুম:
যাকাত ইসলামী বিধান-শাস্ত্রের পাঁচটি শর্ত সাপেক্ষে আদায় করা ফরযে আইন। ফরয হওয়ার ব্যাপারে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমার দলীল বিদ্যমান। ফরয হওয়াকে অস্বীকারকারী ও প্রদান করতে অস্বীকারকারী ধর্মদ্রোহী এবং ফরয হওয়া সত্ত্বেও যে প্রদান করে না সে প্রকাশ্য ফাসেক হিসেবে বিবেচিত হবে। (কিতাবুল ফেকহ)
যাকাত ফরয হওয়ার শর্তবলী:
১.মুসলমান হওয়া, ২.স্বাধীন হওয়া ৩.প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, ৪.সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া, ৫.পূর্ণাঙ্গ মালিকানা হওয়া, ৬.মালিকানার নেসাব পূর্ণ হওয়া, ৭. মাল মৌলিক প্রয়ােজনীয় না হওয়া, ৮.মাল ঋণমুক্ত হওয়া, ৯.মাল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ভাবে বর্ধনশীল হওয়া যেমন- পশু, স্বর্ণ ও রৌপ্য মালিকানায় পূর্ণ এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া।(আল ফিকহুল মুয়াসসার)
নেসাবের পরিমাণ:
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য নেসাবের মালিক হওয়া অন্যতম শর্ত। যাকাত প্রদানের জন্য মালের বিভিন্নতার ক্ষেত্রে নেসাবও বিভিন্ন হয়ে থাকে।
ক. স্বর্ণ সাড়ে ৭ ভরি, খ, রৌপ্য সাড়ে ৫২ ভরি, গ.গরু ৩০টি, ঘ. ছাগল ৪০টি, ৬. উট ৫টি, চ. ব্যবসায়ের পণ্য এবং খনিজ সম্পদের যাকাতের নেসাব নির্ধারিত হবে স্বর্ণ বা রৌপ্য নেসাবের মালের পরিমাণ দ্বারা, ছ. ফসল অল্প হােক বেশি হােক ওশরী জমি হলে তাতে ১০ ভাগের ১ভাগ বা নিচফে ওশর অর্থাৎ ২০ ভাগের ১ভাগ ১ ওয়াজিব হবে।
যাকাতের পরিমাণ:
নেসাবের ন্যায় যাকাতের পরিমাণও বিভিন্ন হয়ে থাকে।
১.স্বর্ণ-রৌপ্য, বা ব্যবসায়ী পণ্যের ক্ষেত্রে যাকাতের পরিমাণ শতকরা আড়ায় ভাগ অর্থাৎ প্রতি ৪০ টাকায় ১টাকা।
২.খনিজ সম্পদের যাকাত হলাে পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
৩.যে সকল ওশরী জমি বৃষ্টির পানিতে চাষাবাদ হয় তাতে দশ ভাগের এক অংশ।
৪.আর সেচ দিয়ে ফলানাে ফসলে বিশ ভাগের এক অংশ যাকাত দেয়া আবশ্যক।
যাকাত প্রদানের সুফল ও উপকারিতা:
রিযিকের মালিক আল্লাহ। যাকে ইচ্ছা তিনি সম্পদ বাড়িয়ে দিতে পারেন। আর যাকাত দাতাকে সম্পদ বাড়িয়ে দেয়ার সুসংবাদ তিনি ঘােষণা করেছেন। তাই বলা যায়, যাকাত দিলে সম্পদ কমে না বরং বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কুরআনে ঘােষিত হয়েছে- 'নিশ্চয় আমার পালনকতা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং (যাকে ইচ্ছা) সীমিত পরিমাণে দেন। তােমরা যা কিছু ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দেবেন। আর তিনি উত্তম রিফিকদাতা। (সূরা সাবা) অন্যদিকে যাকাত দানে পূন্য যেমনি বৃদ্ধি পায়, তেমনি সম্পদেও বরকত তথা বৃদ্ধি ঘটে। বাহ্যিকভাবে সম্পদের শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত প্রদানে মাল কমে যেতে দেখা গেলেও মূলত বৃদ্ধিই পায়। পক্ষান্তরে সুদের মধ্যে আর্থিক বৃদ্ধি হলেও প্রকৃতপক্ষে তাতে কোন বৃদ্ধি ও সুফল নেই। এমর্মে কালামে পাকে এরশাদ হয়েছে 'আল্লাহ তা'আলা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান বর্ধিত করেন। বস্তুত আল্লাহ তা'আলা কোন অবিশ্বাসী পাপীকে ভালবাসে না (সূরা বাকারা, আয়াত-২৭৬)
যাকাতের সম্পদের বৃদ্ধির সাথে সাথে সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ হয়। মানুষের বিভন্ন অন্যায়, অপরাধ, কৃতকর্মের কারণে অনেক বালা মুসিবত, বিপদ-আপদের সম্মুখীন হতে হয়। যাকাত দিলে যাকাতদাতা, যাকাতদাতার সম্পদ বালা-মুসিবতে ধ্বংস হয় না। সুতরাং মাল অনর্থক ধ্বংস না হওয়াও এক প্রকার বৃদ্ধি। তাই রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-"সাদকায় বালা-মুসিবত দূর হয়।"
যাকাত দানের ফলে রিযিক ও সম্পদের প্রসারতা, সম্পদের পবিত্রতা ও মালের প্রাচুর্যতা শুধু ইহকালে সীমাবদ্ধ নয়, বরং
যাকাতের ফলে আখিরাতেও সওয়াবের পরিমাণ বেড়ে যায়। তা এক থেকে সাতগুণ অথবা তার চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পায়।আল-কুরআনে এ ব্যাপারে এরশাদ হয়েছে-যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একই বীজের মতাে, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় । প্রত্যেকটি শীষে একশত করে দানা তৈরি হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরাে বাড়িয়ে দেন, তিনি অতীব দানশীল, সর্বজ্ঞ।সুরা (বাক্কারা,আয়াত-২৬১)
সূত্র মাসিক তরজুমান
%20%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%9C%E0%A6%BE%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%B0%E0%A7%80%20%E0%A6%87%E0%A6%AB%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0.jpg)